বৃহস্পতিবার , ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

কবিতা

কবি নাফিউল হক এর গুচ্ছ কবিতা


নদী-নালার নিহিত নাকশা

হেঁকে উঠল কে— ভেজা ইটের আঙিনা ধরে সমস্ত শেওলা মুখে পুরনো ঘৃণার ছাপ, ফুটো কল থেকে ঝরে পড়া পানি গায়েব করে দেয় একেকটা কুকুর জন্ম।
হ্যাঁচকা ধাক্কায় বাঁক নেয় অলিগলি— জোড়া লাগা সিঁড়ির গোপন সুরে যেন কেউ আঁকছে কাদার ক্যালেন্ডার।
বেহুঁশ রোদ্দুর আজও নাকি বুকের ভেতর জমা করে রেখেছে অপমানের রবিশ্মশান।
আমি হাঁটি, আঁশটে গন্ধে ভিজে থাকা অদ্ভুত সিগন্যালের দিকে। মাঝে মাঝে দেখি— জঞ্জালের পাহাড়ে মাথা তোলে
একটা শিশুমাপের প্রতিরোধ, তার নরম হাত একটা ভাঙা রিকশার হুডে লিখে দেয় ঋতুর কঙ্কাল।
এভাবে শীত কাটে। এভাবেই কুয়াশা থেকে ‍জন্ম নেয় প্রাণের নিঃশ্বাস— যাকে আমরা ভুলে যাই, ভুলেই থাকি অবলীলায়।


অদেখা করতল

কোন অজুড়ে ভাঙছে শুনি খয়েরি সন্ধ্যার চোয়াল? লালচে রুক্ষ রোদে সোঁদা আঁশটে তাপ— কে এক বিস্মৃত দেবতার ছাই-গলায় ঝুলছে কাচের বাঁশির মতো চুপচাপ, নড়বড়ে স্বর। দূরে টলমল গর্ভপাতি রোদ্দুর, পুরনো শাপলা-পাতার দাগে নেমে গেছে— ধরে আনা যায় না আর; সেই বুনো হাঁসেদের চামড়া কেটে। বাঁধা থাকে ঘুম-খাওয়া লজ্জার গন্ধে।
পশমভরা বাতাসের ভিতর দিয়ে একটা গোল চাপা শব্দ উঠে আসে— নিঃশেষ হওয়া বৃষ্টির ঢেউয়ে হঠাৎই জন্ম নিতে চাওয়া মৃতশিশুর মতো দেহভূমির তলার রুলটানা কাদা ছুঁয়ে যায় আরও খানিকটা তর্কাতীত ভাঙন।
এদিকে কাঁকড়ার শুঁড়ের মতো বাঁকা হয়ে পাখিদের হাড়ে লেগে আছে বিরূপ নীলচে আলো— কে জানে কোন প্রভুর লেজধরা ঈশান-হাওয়া দু’মুঠো কালোহলদে কাশফুল উড়িয়ে, মাটির বুকে বেঁধে দিচ্ছে অঘোষিত বিদ্রোহের বাঁধন।
শেষমেশ সন্ধ্যার কালচে চাঁদ কান চুলকে বলে দেয়। অদেখা করতলের ছায়া আগুনের মতো পাকে উঠছে,
আর পৃথিবীর পিঠে চিনচিনে এক সত্য পঁচা গন্ধে জন্ম নিচ্ছে আরও একটা অসম্ভব রাত।


নিভু-নিভু রোদ্দুরের নিচে

সেঁতসেঁতে ঢোলের শব্দে দুপুর যখন ভিজে ওঠে,
তখন দেখি— গোঁফঝোলা বাতাসের পাশে দাঁড়িয়ে আছে চূর্ণ-বিচূর্ণ ধূলিকণায় জন্ম নেওয়া এক ছায়া, মাঠের ঘাসে লুটিয়ে থাকা পরিত্যক্ত রংগুলো জেগে ওঠে হঠাৎ, যেন কাচের ভেতর মাছের হৃদস্পন্দন।
মাটির থালায় জমে ওঠা ধানভাঙা চিহ্ন, মায়ের আঙুলের মতো কাঁপতে থাকে— সেই থরথরানি পেরিয়ে গিয়ে আমি শুনি, টিনের চালের ওপর রোদে পোড়া একটা গল্প পাতা উল্টাতে উল্টাতে কাঁদছে। বাতিকগ্রস্ত সোনালি চিল উড়তে গিয়ে পড়ে যায় আকস্মিক, রোদ্দুরের গর্ভে ঢুকে গেছে অতিদূরের ভাঙা দোয়েলদের ডাক।
হাটফেরত নোনাজল হাতে, গাভীর মতো আস্তে আস্তে হাঁটে সন্ধ্যা; তার পায়ের দাগে ফুটে ওঠে দুধ-সাদা কচুরিপানা।
আমার ভিতর তখন মরি-মরি গন্ধের মতো শাঁখারির ব্যথা জন্ম নেয়, নিঃশ্বাসে বাজে পুরোনো কবরের ঝুনো বাতাস।
যদি খড়ের গাদার পাশে একটা উনুন থাকত এখনও, তার ধোঁয়ায় গলে যেত আমার ঘুমহীন প্রাণ; এক চিলতে নোনাধরা আলোর নিচে হঠাৎ দেখা মিলত যুবতী বৃষ্টির, যে জোড়াতালি লাগে শরীরের ছায়ায়— যেমন নোনাপুকুরের গভীরে ডুবে থাকে এক মৃণাল, ফিরে আসার কোনো বাসনা ছাড়া।


আরও