জুলাই মাস। হঠাৎ করেই নামল এক ক্ষণিকের বৃষ্টি। প্রকৃতির আচরণে কোথাও একটা অমিল, যেন সব কিছু ঠিকঠাক চলছে না।ভাবছি, এই অসময়ে এমন ভ্যাবসা তাপে প্রকৃতির এই অমেয় চঞ্চলতা কেন! এ কি ঋতুর অভিমান না কি প্রকৃতির ভেতরেও জমছে কোন অনুচ্চারিত ক্ষোভ! মেঘগুলোকে দেখে মনে হয়, তারা যেন ক্লান্ত কোন পলাতক, দিগন্তের কিনারায় দাঁড়িয়ে কাঁপছে নীরবে। আর বৃষ্টি সেই ক্লান্তির নিঃশ্বাস।
পৃথিবীর ঘাম না শুকাতেই, আকাশ নিজেই ঘেমে উঠছে। এই ভিজে-উষ্ণ আবহে হঠাৎ চোখ পড়ল টেবিলের কোণে রাখা খাতাটার দিকে। দুটি অসমাপ্ত কবিতা পড়ে আছে সেখানে-নির্জন, নিজের ভাষা খুঁজে ফিরছে, যেন কিছু হতে চেয়েছিল, কিন্তু কী-তা নিজেরাও জানে না।
এই নিরুত্তাপ মুহূর্তে, প্রকৃতির বৃষ্টিধোয়া আবহের মতোই, আমার ভেতর থেকে ভেসে ওঠে কিছু অনুচ্চারিত অনুরণন, যা অনেকদিন ধরে মনের গহনে জমে ছিল, নিরুত্তাপ, নিঃশব্দ। এই আধা-জাগ্রত সৃজনের মুহূর্তে, যখন লেখাটি ঠিক ‘কবিতা’ হয়ে ওঠেনি, কিন্তু অনুভবের বহিঃপ্রকাশে চঞ্চল, ঠিক তখনই একসময় শুধু অনুভবে থাকা প্রশ্নগুলো ভাষার তটে এসে আছড়ে পড়ে-আমি কেন লিখি? কার জন্য লিখি? একজন পাঠক কী আশা করতে পারেন আমার লেখায়?
প্রশ্নগুলো আপাত সরল মনে হলেও, এর অন্তরজগতে নিহিত রয়েছে গভীর এবং বিস্তৃত এক আত্মজিজ্ঞাসা।
আর তাই হয়তো, এই বর্ষণের ছায়া-আবিষ্ট দুপুরে যখন প্রকৃতি নিজেকে পুনরাবিষ্কার করছে, তখন আমিও আমার লেখার কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে পুনর্বিবেচনায় বসি। কারণ, “কেন লিখছি?” এই প্রশ্নের উত্তর না থাকলে, “কী লিখছি” তারও কোনো মূল্য থাকে না।
আমি কেন লিখি, তার হয়তো একটা সহজ ব্যাখ্যা দাড় করানো যেতে পারে-ভাষাহীন অভিজ্ঞতা, চাপা স্মৃতি, অব্যক্ত আবেগের একটি বোধগম্য কাঠামোর খোঁজে লিখি। তবে সময় ও অভিজ্ঞতার সাথে সেই ব্যাখ্যাও বদলে যাবে। কেননা এই প্রশ্ন লেখকের কাছে প্রতিবার নতুনভাবে ফিরে আসে, বিশেষ করে নির্জনতায়, প্রাকৃতিক বিক্ষোভে, যখন বাইরের জগৎ ও অন্তর্জগৎ একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এ কোনো সোজাসাপ্টা প্রশ্ন নয়, এ যেন আত্মার দর্পণে মুখোমুখি হওয়া।
প্লেটোর “দ্বৈত জগৎ তত্ত্ব” এখানে স্মরণযোগ্য। লেখকের বাস্তব জগৎ এক, কিন্তু যেটি লেখায় উঠে আসে তা একটি অনির্বচনীয় আদর্শ জগৎ। সেই আদর্শেই লেখক বারবার ফিরে যেতে চায়। তাই, “আমি কেন লিখি”-এর উত্তর খুঁজে চলা এক প্রকার অন্তর্গত ডাক।
আমি বিশ্বাস করি, একজন লেখকের কলমে যখন ভাষা রূপ পায়, তা কেবল কাগজে শব্দমালার সংকলন নয়; এটি এক অন্তর্নিহিত আত্মঅন্বেষণ। এই আত্মঅন্বেষণ করতে গিয়ে লেখক এককভাবে তার নিজের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে বৃহৎ দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন। নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির সীমানা পেরিয়ে তিনি সমাজের, ইতিহাসের, সংস্কৃতির গভীর প্রবাহের এক অংশ হয়ে ওঠেন। সাহিত্যের ইতিহাস আমাদের দেখায়, লেখক কখনও কেবল ব্যক্তিগত থাকে না। অভিজ্ঞতায় তার ব্যক্তিসত্তা ক্রমে এক “সমষ্টির কণ্ঠস্বর” হয়ে ওঠে। সেই কণ্ঠস্বর কখনো নিপীড়িতের, কখনো প্রতিরোধের, কখনো সমাজ-অসুখের, কখনো নিছক মানবিক কোমলতার।
এখানেই আসে মৌলিক প্রশ্ন-লেখক কী তবে কারো জন্যই লিখেন? উত্তর সরল: হ্যাঁ, লেখক কারো জন্যই লিখেন। কিন্তু সেই “কারো” কে?
সে কি নিঃশব্দে পাশে বসে থাকা এক পাঠক, যার নাম জানি না, মুখ দেখি না, কিন্তু যার উপলব্ধির গভীরে শব্দের রেশ পৌঁছাতে চাই? সে কি সেই ভবিষ্যতের সময়, যেখানে আমাদের আজকের উচ্চারণ এক নিঃশব্দ দলিল হয়ে থাকবে? নাকি সেই “কারো” মানে-সমষ্টিগত এক মনুষ্যতা, এক বৃহত্তর অনুভব, যেখানে আমি আর “আমি” নই, “আমরা” হয়ে উঠি?
মূলত, এই “কারো” কোনো একক ব্যক্তি নয়, এ এক বহুমাত্রিক ও গতিশীল ধারণা, যার অস্তিত্ব ক্রমশ পরিবর্তিত হয় সময়ের প্রবাহে, সমাজের ক্রিয়াশীল গতিতে এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তনের উত্তাপে। এই “কারো” হতে পারে পাঠক, হতে পারে সমাজের কণ্ঠস্বর, সময়ের অদৃশ্য প্রবাহ, প্রতিবাদের আগুন, জাগরণের সংকেত, কিংবা পরিবর্তনের অনিবার্য প্রেরণা।
আমেরিকান ঔপন্যাসিক টনি মরিসন এই ভাবনাকে এক গভীর দায়িত্ববোধে রূপ দিয়েছিলেন।
“এটাই সেই সময় যখন শিল্পীরা কাজে নামেন। হতাশার কোনো সময় নেই, আত্মদয়ায় ডোবার কোনো জায়গা নেই, নীরব থাকার প্রয়োজন নেই, ভয়ের কোনো স্থান নেই। আমরা কথা বলি, আমরা লিখি, আমরা ভাষা তৈরি করি। এভাবেই সভ্যতাগুলো আরোগ্য লাভ করে।”
এই উক্তিটি টনি মরিসনের, ২০১৫ সালে ‘দ্য নেশন’ পত্রিকার জন্য লেখা একটি নিবন্ধ থেকে এসেছে।
মরিসনের এই বক্তব্য শুধু সংকটময় সময়ে শিল্পীর ভূমিকা নিয়ে নয়; এটি লেখকের ভাষা ও সৃষ্টির সার্বজনীন দায়িত্বের ঘোষণা। এখানে লেখক কেবল এক স্রষ্টা নন; তিনি হয়ে ওঠেন সমাজের আরোগ্যপ্রক্রিয়ার এক অনিবার্য অংশ, যেখানে ভাষা হয়ে ওঠে ওষুধ, আর শব্দের বিন্যাস হয়ে ওঠে এক চিকিৎসা।
অতএব, এই ‘কারো’ কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিবর্তে হয়ে উঠে এক অন্তর্নিহিত, বহুমাত্রিক ভাবনা ও দায়িত্ব, যা লেখাকে জীবন্ত করে, লেখককে পাঠক-সমাজের সাথে এবং বৃহত্তর সময়ের সাথে সংযুক্ত রাখে। এমনকি যখন লেখক নিজেকে একান্ত স্বকীয়তা মনে করেন, তখনও এই ‘কারো’র উপস্থিতি তার শব্দে সুর দেয়, তাকে নির্ধারণ করে এবং তার কাজের পরিধি বিস্তৃত করে।
সুতরাং, ‘কারো জন্য লিখি কি না’-এই প্রশ্নের উত্তর যতই সরল হোক, এই অনিবার্য সত্যটুকু স্বীকার করতে হয় যে লেখকের ভাষা একবার কাগজে স্থিত হয়ে গেলে তা আর শুধুমাত্র লেখকের দখলে থাকে না। লেখা তখন হয়ে ওঠে এক যৌথ যাত্রা। এই যাত্রা ব্যক্তিগত হলেও, গন্তব্যে পৌঁছে তা হয়ে ওঠে সমষ্টিগত, যেখানে পাঠক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আবেগ দিয়ে সেই লেখাকে নতুন অর্থে পুনর্নির্মাণ করে। ফলে, লেখকের সৃষ্ট শব্দ আর স্থির থাকে না; তা ক্রমাগত রূপান্তরিত হয়, বেড়ে ওঠে, ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের মনে ভিন্ন ভিন্ন জীবনের মতো বেঁচে থাকে।
এভাবেই লেখা এক অবিরাম সংলাপের জন্ম দেয়-লেখক, পাঠক, সময় এবং ইতিহাসের মধ্যে।
পাঠক বা সমাজ, সময় ও ইতিহাস তবে লেখকের ভাষা থেকে কি আশা করতে পারেন? পাঠকই তো এখানে সমাজের প্রতিনিধি। তিনি আশা করতে পারেন সততা এবং অন্তর্দৃষ্টি, যা লেখকের অন্তর থেকে উঠে এসে তার নিজের অনুভূতিকে ছুঁয়ে যায়। তিনি চান এমন একটি সেতু, যা লেখকের গভীর আত্মজগতকে তার চেতনায় নিয়ে আসে। পাঠক প্রত্যাশা করে প্রশ্নবোধ, এবং নতুন ভাবনার উদ্রেক, পাশাপাশি নৈতিকতার পরিচায়ক এক ভাষার প্রয়োগ, যা লেখকের বিবেক ও দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। এই নৈতিক অনুশীলন লেখাকে রূপান্তরিত করে এক মিথস্ক্রিয়ায়, যেখানে লেখক-পাঠক উভয়ই প্রশ্ন করে, অনুসন্ধান করে এবং অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে। লেখকের কাজ নিশ্চয়ই পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ নয়; তবে, তাদের মধ্যকার সংলাপ থেকেই অর্থের সৃষ্টি সম্ভব হয়।
সময় লেখকের লেখায় চায় একটি নিঃস্বার্থ নথিভুক্তি, মুহূর্তের আবেগ, চিন্তা, সংকট ও সম্ভাবনার সংরক্ষণ। সময় প্রত্যাশা করে, লেখক যেন ভুল ও সংকটকে চিহ্নিত করে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এবং অচলাবস্থায় নতুন পথ দেখানোর সাহস প্রকাশ করে।
অপরদিকে, ইতিহাস লেখকের কলম থেকে আশা করে এক সাক্ষ্য, যা ভবিষ্যতের মানুষকে জানাবে আমরা কবে, কীভাবে বেঁচেছিলাম, ভেবেছিলাম, লড়েছিলাম বা হারিয়েছিলাম। এটি মানবতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, অতীতের জ্ঞান ও বেদনা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয় এবং সমালোচনার সুযোগ করে দেয় যেন ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের নয়, নিপীড়িত ও বিস্মৃত মানুষেরও গল্প বলে। এই প্রত্যাশাগুলো মিলিয়ে লেখকের কাজ হয়ে ওঠে এক জটিল, বহুমাত্রিক দায়িত্ব-যা ব্যক্তিগত সৃষ্টিকর্মকে পরিণত করে সমাজের, সময়ের ও ইতিহাসের সঙ্গে এক জীবন্ত সংলাপে।
পেরুর ঔপন্যাসিক মারিও ভার্গাস লোসার জনপ্রিয় উক্তিটি না টানলেই নয়, “একজন লেখকের কাজ হলো কঠোরতা ও নিবেদন নিয়ে লেখা, নিজের বিশ্বাসকে সমস্ত প্রতিভা দিয়ে রক্ষা করা। আমি মনে করি এটি একজন লেখকের নৈতিক বাধ্যবাধকতার অংশ, যা কেবল নিছক শৈল্পিক হতে পারে না। লেখকের অন্ততঃ কিছু না কিছু সামাজিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করার দায়িত্ব থাকে। আমি মনে করি, যদি সাহিত্য মানুষের, সমাজের, এবং জীবনের মূল আলোচনার অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তা গরিব হয়ে পড়ে।”
লোসার এই নৈতিক ঘোষণার সঙ্গে জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের হারমেনিউটিক চক্র ধারণার সাযুজ্য লক্ষণীয়, যদিও তাঁদের মনোযোগের ক্ষেত্র আলাদা-হাইডেগারের ক্ষেত্রে অস্তিত্ব ও শিল্প, লোসার ক্ষেত্রে সাহিত্য ও সমাজ। উভয়ের দৃষ্টিতে, অর্থ সৃষ্টির প্রক্রিয়া কখনোই বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি একটি আন্তঃসম্পর্কিত, চক্রাকার বিন্যাস, যেখানে প্রতিটি উপাদান অপরটির মাধ্যমে আলোকিত হয়।
ধর্মতত্ত্ববিদ এবং দার্শনিক সেন্ট অগাস্টিন বিশ্বাস ও যুক্তির পারস্পরিক নির্ভরতাকে যে চক্রাকার কাঠামোর মধ্যে দেখেছিলেন, জার্মান দার্শনিক হাইডেগার (১৯২৭) সেই ধারণাকে অস্তিত্ববাদী প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মাণ করেন। তাঁর মতে, বোঝা কখনো সরলরৈখিক নয়; বরং এটি একটি অন্তহীন বৃত্ত, যেখানে অংশ ও সমগ্র পরস্পরকে আলোকিত করে। The Origin of the Work of Art (১৯৩৫–১৯৩৬)-এ তিনি শিল্প, শিল্পী ও শিল্পকর্মের সম্পর্ককে ত্রিমুখী চক্র হিসেবে দেখান-যেখানে কোনোটিই অন্যের বাইরে থেকে সত্তাগতভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। শিল্পকর্ম তার বস্তুগত চরিত্র ও প্রতীকী মাত্রা মিলিয়েই অর্থের পরিপূর্ণতা পায়; এই প্রক্রিয়া নিছক নান্দনিক তত্ত্ব নয়, বরং বাস্তব অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
লোসা একই নীতিকে সাহিত্য ও সমাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। তাঁর মতে, সাহিত্য যদি লেখক, তার বিশ্বাস ও সমাজের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা কেবল শূন্য অলঙ্কারে পরিণত হয়। যেমন হাইডেগারের চক্রে শিল্পকর্ম ও শিল্পী একে অপরের প্রেক্ষাপটে পূর্ণতা লাভ করে, তেমনি লোসার দৃষ্টিতে সাহিত্য ও সমাজের সম্পর্কও পারস্পরিক-সাহিত্য সমাজকে ব্যাখ্যা করে, আর সমাজ সাহিত্যকে অর্থ দেয়।
উভয়ের দর্শনে বোঝাপড়া মানে কেবল বৌদ্ধিক বিশ্লেষণ নয়, বরং সক্রিয় ও দায়বদ্ধ অংশগ্রহণ। হাইডেগারের ভাষায় এটি “চক্রে প্রবেশের শক্তি”, আর লোসার ভাষায় এটি “লেখকের নৈতিক দায়বদ্ধতা”-যেখানে শিল্প ও সাহিত্য জীবনের বৃহত্তর বাস্তবতার ভেতরেই তার প্রকৃত রূপ ও মর্যাদা লাভ করে।
এখানেই দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্রে’র স্বাধীনতা ও নৈতিক দায়িত্বের তত্ত্ব আলোচনায় একটি তৃতীয় স্তর যোগ করে। সার্ত্রে তাঁর “What is literature”-গ্রন্থে বলেন, “গদ্য লেখন চলছে অবধারিতভাবে রাজনৈতিক এবং নৈতিক নৈকট্যের সাথে, লেখকের ইচ্ছার অপেক্ষা ছাড়িয়ে।”
সার্ত্রে, আমাদের শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে তিনি আমাদের জন্মগত স্বাধীনতার কথা বলেন এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে শিল্প আমাদের নৈতিকতা ব্যবস্থাকে গঠনে সাহায্য করে তা প্রকাশ করেন। সার্ত্রে দেখান, শিল্প সমাজের মধ্যেই অবস্থান করে এবং সমাজকে প্রভাবিত করে, ঠিক যেমন সমাজও শিল্পকে প্রভাবিত করে।
অর্থাৎ, লেখকের স্বাধীনতা কেবল আত্মপ্রকাশের সুযোগ নয়, বরং নৈতিক জবাবদিহির আহ্বান।
লোসার উক্তির “সামাজিক আলোচনায় অংশগ্রহণ” তাই সার্ত্রে’র দৃষ্টিতে কেবল জরুরি নয়, বরং লেখকের অস্তিত্বেরই এক অপরিহার্য অঙ্গ। অতএব, অগাস্টিনের যুক্তি-বিশ্বাসের বৃত্ত, হাইডেগারের অংশ-সমগ্রের হারমেনিউটিক চক্র, এবং সার্ত্রে’র স্বাধীনতা দায়বদ্ধতার তত্ত্ব-সবই লোসার বক্তব্যে এসে এক বিন্দুতে মিলিত হয়।
বৌদ্ধিক পাণ্ডিত্য তো সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে, আমার মতো ক্ষুদ্রজ্ঞানের মানুষের কাছে এই বিশাল জগতের জ্ঞানের ধারণাটুকু বোঝা কতটা সম্ভব, তা বলা কঠিন। ক্ষণিকের বৃষ্টি যেমন মেঘেদের থমকে থাকা আলস্যের মাঝে অনায়াসে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি আমার মনও জটিল দার্শনিক আলোচনার মাঝে নড়বড়ে ভাবনার আলোকে ভাসে। তবে এই দুর্বলতার মাঝেও এটুকু বলতে পারি-সাহিত্যে লেখকের নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়ানো মানে কেবল সৃষ্টিশীলতার সীমাবদ্ধতায় আটকা পড়া নয়; বরং সেই সাহিত্যকে মানুষের জীবনের গভীর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, যা তার প্রাণশক্তিকে নিঃস্ব করে ফেলে। সাহিত্যচর্চা কেবল ভাষার নন্দনশৈলী নির্মাণের প্রক্রিয়া নয়; এটি একইসঙ্গে একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক অনুশীলন। লেখকের নৈতিক দায়বদ্ধতা বলতে আমরা বুঝি-তাঁর সৃষ্ট রচনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সম্পর্কে গভীর সচেতনতা, এবং সেই প্রভাবের ইতিবাচক ও নেতিবাচক সম্ভাবনার বিবেচনা। এর অন্তর্ভুক্ত হয় প্রান্তিক ও বঞ্চিত কণ্ঠস্বরকে অগ্রাধিকার দেওয়া; অবচেতন পক্ষপাত ও সাংস্কৃতিক স্টেরিওটাইপের পুনরুৎপাদন থেকে বিরত থাকা; এবং ভাষাকে নিছক নান্দনিক বিনোদনের মাধ্যম না বানিয়ে, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়ের বাহক রূপে গড়ে তোলা।
অবশ্য লেখকের নৈতিক দায়বদ্ধতা কতটুকু বাধ্যতামূলক তা নিয়ে বুদ্ধিজীবীরা যুগে যুগে অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত থেকেছেন। একপক্ষের যুক্তি হলো, লেখক শুধুমাত্র নন্দনসৃষ্টির দায়ে আবদ্ধ, তাঁর কাজ হলো সত্য ও সৌন্দর্যের অনুসন্ধান, যা কদাচিৎ অস্বস্তিকর বা সামাজিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে। তবে, নৈতিকতার পূর্বশর্ত চাপিয়ে দিলে শিল্পের স্বায়ত্তশাসন সংকুচিত হয় এবং তা প্রোপাগান্ডার সরলময় বাহক হয়ে পড়ে। এভাবেই লেখকের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়, যার ফলে সৃজনশীলতার প্রকৃত স্ফূরণ বাধাগ্রস্ত হয়।
অপরদিকে, অনেক চিন্তাবিদ, লেখকের নৈতিক দায়িত্বকে সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেন। তাদের মতে, সাহিত্য সামাজিক বাস্তবতার অন্তর্গত এবং প্রতিটি বর্ণনা নিঃসন্দেহে কোনো না কোনো মূল্যবোধের পুনরুত্পাদন অথবা প্রতিরোধের মাধ্যম। এই পরিপ্রেক্ষিতে, নৈতিক সচেতনতা বিহীন সাহিত্য অপরিপূর্ণ এবং সমাজের জন্য সম্ভাব্য ক্ষতিকর।
আমরা জানি, নৈতিক দায়িত্ব সাহিত্যকে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখে; আবার অতিরিক্ত নৈতিক শর্তারোপ সৃজনশীলতার মুক্ত বিচরণেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
অতএব, লেখকের নৈতিক দায়বদ্ধতা একপাক্ষিকভাবে বাধ্যতামূলক নয়-বলা যায়। বরং এটি একটি চলমান দ্বিমুখী সংলাপ, যেখানে শিল্পের স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়বোধ পরস্পর ক্রমাগত আলোচনার মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
এই প্রসঙ্গে ফিরে আসি মারিও ভার্গাস লোসার কথায়, যিনি লেখকের নিবেদন ও নৈতিক বাধ্যবাধকতার গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন-লেখকের কাজ শুধুমাত্র শৈল্পিক সৃষ্টিই নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে দর্শনীয় গভীরতায় উপলব্ধি করতে আমাদের সাহায্য করে হারমেনিউটিক চক্রের ধারণা, যেখানে বোঝাপড়া একটি অন্তহীন সংলাপ; অংশ ও সমগ্র একে অপরকে ব্যাখ্যা ও পরিপূর্ণ করে।
ঠিক এখানেই আমার দ্বন্দ্ব। যুক্তির বাইরে গিয়েও আমি মানি, লেখকের সৃষ্টিশীলতা কখনো সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকে না-তার অন্তর্গত এক অন্য ধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা আছে, যা কখনো স্পষ্ট হয়, কখনো মৃদু হলেও অনুভূত হয়। সেই দায়িত্বের ভার কখনো চাপ, কখনো প্রেরণা, আবার কখনো নিষ্ঠুর এক স্বপ্নের মতো লেগে থাকে, তবু তাকে এড়ানো যায় না।
এই শিল্প ও নৈতিকতার অটুট বন্ধন আমার চিন্তার গতি বাড়িয়ে দেয়। আর তাই হয়তো লেখকের নৈতিক দায়বদ্ধতাকে আমি স্বীকার করলেও, এই যে আমার অসমাপ্ত কবিতা দু’খানি এখনো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে-তার দায়ও আমাকেই নিতে হয়। কারণ, সেই অসমাপ্ততা আমারই অন্তর্গত দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তের ফল। কবিতাগুলো থেমে গেছে আমার ভেতরের টানাপোড়েনের কাছে-স্বাধীনতা আর নৈতিক দায়বদ্ধতার দ্বন্দ্বে আমি নিজেই তাদের গতি আটকে দিয়েছি। তবু, এই টানাপোড়েন নিয়েই আমি লিখি। কখনো তা পূর্ণ স্বাধীনতা পায়, কখনো হয়তো অবচেতন মনেই নৈতিকতার দেয়াল টপকিয়ে মুক্তি লাভের স্বপ্ন দেখে; আবার কখনো নৈতিক দায়বোধে সেই দেয়ালেই আটকে পড়ে। আমার কবিতা দু’খানি হয়তো ঠিক এই তিন অবস্থার ভেতরই ঘুরপাক খাচ্ছে-কখনো মুক্তির স্বাদ নিচ্ছে, কখনো গোপনে দেয়াল টপকানোর স্বপ্ন দেখছে, আবার কখনো নৈতিক দায়বোধে সেই দেয়ালেই থেমে যাচ্ছে। এই যে এক জটিল দ্বন্দ্ব-ঠিক সেখানেই আমার সৃষ্টির নাড়ি স্পন্দিত হয়।এই দ্বন্ধই আমাকে অবিচ্ছিন্নভাবে ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং খোঁজার পথ ধরে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে।
চিন্তার এই জটিলতায়, কখন যে মেঘেরা আকাশের বুকে লুকিয়ে পড়েছে, টেরই পাইনি। ক্ষণিকের বৃষ্টি এখন অতীত; প্রকৃতি ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছে তার আপন ঠিকানায়। কিন্তু আমার অন্তরের অন্ধকারে ঘুরতে থাকা প্রশ্নগুলো এখনো ভেতরের ‘আমাকে’ নিয়ে খেলছে। এ এক অদ্ভুত কঠিন পরীক্ষা একজন লেখকের জন্য-যার মধ্য দিয়েই নিজের সীমাবদ্ধতা, নৈতিক দ্বিধা ও সৃষ্টির মুক্তির মধ্যে সূক্ষ্ম সামঞ্জস্য খুঁজে পেতে হয়। কিন্তু আমি তো জানি, প্রকৃতির মতোই আমার লেখাও কখনো স্বচ্ছ, কখনো মেঘাচ্ছন্ন; কখনো নিরিবিলি, কখনো তীব্র ঝড়ের মতো, আবার কখনো একেবারেই বধির।
লেখক পরিচিতিঃ
এইচ বি রিতা-পেশা-শিক্ষকতা। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে তিনি স্নায়ুবিক, মানসিক ও জ্ঞানীয় বিকাশে পিছিয়ে থাকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করছেন। তিনি নিউইয়র্ক সিটিতে ‘এইচ.আর কানেক্ট’-প্রশাসনিক সহকারী হিসাবে এবং ইউনাইটেড ফেডারেশন অফ টিচার্স-এ কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। শিক্ষকতা করেছেন নিউইয়র্ক সিটির ভার্চুয়াল হাইস্কুল ‘এ স্কুল উইদাউট ওয়ালস’-এ।
এইচ বি রিতা-বাংলাদেশের নরসিংদী শহরে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন দীর্ঘ ২৭ বছর যাবত। তিনি নিউইয়র্কের ‘টুরো কলেজ এন্ড ইউনিভার্সিটি’ থেকে তার উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন। এইচ বি রিতা একজন সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট, এবং কবি।
তাঁর আটটি কাব্যগ্রন্থ সহ দুটো উপন্যাস, একটি প্রবন্ধ, দুটো ছোটগল্প, দুটো স্মৃতিচারণমূলক বই এবং জুলাই ছাত্র জনতার বিপ্লব নিয়ে চব্বিশের অভিধান “২৪-এর জুলাই ছাত্র-জনতার বিপ্লব” নামক একটি বই প্রকাশ হয়েছে। এরমধ্যে ইংলিশে একটি স্মৃতিচারণ ও একটি কবিতার বই প্রকাশ হয়েছে ম্যাককিনলি পাবলিশিং হাব, যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এ বছর ২০২৬-এ তাঁর একটি উপন্যাস, একটি কাব্যগ্রন্থ ও প্যারেন্টিং নিয়ে গবেষণামূলক বইটি প্রকাশ হচ্ছে ঘাসফুল প্রকাশনী থেকে।
