কবি হুসনা তাসনিমা আনজুম এর গুচ্ছ কবিতা

লেখক: Bangla Charu
প্রকাশ: জুলাই ৩, ২০২৬

কবির পরিচিতি

হুসনা তাসনিমা আনজুম
সাহিত্যের নিভৃতচারী কলম সৈনিক হুসনা তাসনিমা আনজুম ১৯৮৫ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা থানার জগন্নাথপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মাওলানা জামাত আলী এবং মাতা খাদিজা বেগম; তিনি পরিবারের কনিষ্ঠতম সন্তান। শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় পিতার হাতে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথপুর বালিকা দাখিল মাদ্রাসায়, যেখান থেকে ২০০০ সালে তিনি দাখিল সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে মুজিব নগর সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। সেখান থেকে তিনি ‘আরবি ভাষা ও সাহিত্য’ এবং ‘ইংরেজি সাহিত্য’—উভয় বিষয়েই সফলতার সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

শৈশবের সোঁদা মাটির ঘ্রাণ আর গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ তাঁর সাহিত্যভাবনার মূল চালিকাশক্তি। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি এক গভীর অনুরাগ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি স্বনামধন্য সরকারি নার্সিং কলেজে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস ‘নিভৃতে অশ্রু ঝরে’ ও ‘শেষ অশ্রু’ এবং আত্মজীবনীমূলক ও ছোটগল্পের বই ‘রেলস্টেশনে একদিন’ ও ‘আমি আবু সাঈদ বলছি’। সমাজ ও জীবনের সংবেদনশীল প্রতিচ্ছবি তাঁর লেখনীর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

 

বসন্ত এলো

বসন্ত এসে গেছে, বাতাসে মধুর সুর,
ফুটেছে মুকুল আম্র কাননে, কাঁশবন পেরিয়ে মাঠের অদূর।
পাখি ডাকে, নদী বয় হেসে যায় মেঘেরা বহুদূর,
শিশিরের টুপটুপ শব্দে মনে দোলা জাগে ভরপুর।

পড়ে বৃষ্টি, মাটিতে নরম স্পর্শে
প্রকৃতি যেন হেসে একাকার, মুগ্ধতায় অন্তর।
গাছের ডালে ডালে পাখিদের গান,
মনের কোণে বেজে ওঠে বীণ, হাসনাহেনার ঘ্রাণ।

হলুদ, লাল গোলাপ আর গোধূলিতে কাঁঠালি আলো,
বসন্তের রঙে ভরে উঠেছে মনের আলো জ্বালো।
নিমগ্নতায় চুপচাপ বসে শুনি আমি তার ছন্দ,
হৃদয় খুলে দেখি শিহরণ জমেছে, অন্তরের দরজা বন্ধ।

বসন্ত এলো নতুন পাপড়ি মুড়িয়ে, দুলিয়ে পেখম ডানা,
নতুন গানের ডালি সাজিয়ে সহস্র ফুলের মালা।
রবির হাসিতে ঝরে পড়ে মুক্ত কোকিল বাঁধলো বাসা
প্রকৃতির বাহুডোরে নক্ষত্র হাসে, নিয়ে শান্তির আশা।

 

ফজরের নীরবতা

ফজরের আযান বাজে ঐ সুদূরে,
মন ভরে যায় আল্লাহ নামের ডাকের সুরে।
ছোট ছোট কণাবৃষ্টির জলরাশি পাশের রিলে জমে,
ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর, পাখি ডাকের সুরও ছড়ায় আসমানে।

হালকা শিশিরের টুপটুপ শব্দে ভেজা পথ,
শান্ত বাতাসে ভেসে আসে খোদায়ী রহমত।
কুরআন তেলাওয়াত, জায়নামাজে বসে দোয়া,
হৃদয় ঘিরে নেয় অমলিন আলো, অমোঘ আশার ফজিলত।

প্রকৃতির নীরব এ নাচের ছন্দে যেন,
শত বেদনার পর মনের ভাঙা কোণে আসে সান্ত্বনা।
এমনি এক মৌনতায় ভোরের মুহূর্তে ভরে ওঠে হৃদয়,
সৃষ্টিপ্রেম, প্রকৃতির এ নীরব শব্দেই মেতে ওঠা মন-মন্ময়।

 

নীরব রাতের প্রেম

এখন রাতটা বেশ গভীর, শহর ঘুমে ডুবে,
কিন্তু আমার হৃদয় জেগে থাকে তোমার জন্য।
মোবাইলের স্ক্রিনে শুধু তোমার নামটি দেখি,
কিন্তু মনে হয়, তুমি এখানে- আমার ঠিক ডানপাশে।

হিমেল হাওয়ারাও চুপচাপ আসে,
মুখোমুখি না হলেও তোমার স্পর্শ লাগে।
পূর্ণিমা চাঁদ সারা আকাশ জুড়ে তাকিয়ে আছে,
সেই নীরবতার মধ্যেও তোমার হাসি খুঁজে পাই।

এই রাত, শহুরে জীবনেও ঝিঁঝিঁদের নিঃশব্দ ডাক ও সময়,
সবকিছু বলে- কোনো শব্দের দরকার নেই।
দূরত্বও ঘনিষ্ঠতা হতে পারে,
চোখের ঝলকানো আলোও ভালোবাসা বলতে পারে।

যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে,
“কবে প্রেমে পড়েছিলে?”
আমি বলবো-
একটি নীরব রাতের মধ্যে, শব্দহীন গানের মধ্যে,
তোমার নাম বারবার উচ্চারণ করতে করতে।

রাতটি শেষ হবে, কিন্তু এই অনুভূতি থাকবে চিরকাল,
যখন সবাই স্বপ্নে ডুবে,
আমি তখনো তোমার প্রেমে ঘুমাতে পারবো না-
কারণ, তুমি আমার নিঃশব্দ রাতের গল্প।

 

অপেক্ষা

আমি অপেক্ষা করি…
সময়ের ভাঁজে ভাঁজে, নিঃশব্দে, একান্তে…
প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে—
শুধু তোমার জন্য।
তুমি হয়তো জানোই না কতটা ভালোবাসি।

তুমি ব্যস্ত থাকো নিজের পৃথিবীতে,
আর আমি? চুপচাপ বসে থাকি—
কাউকে বলি না, তবুও প্রতিটি নিঃশ্বাসে অনুচ্চারিত থেকে যাও
তোমার একটা মেসেজ,
একটা খোঁজ নেওয়ার অপেক্ষায়।

আমার প্রতিটা সকাল তোমার অনুপস্থিতি জানায়
নীরব বালিশে মুখ লুকিয়ে, স্পর্শহীন সুখেই রাতটি কাটে।
ব্যস্ততার ভিড়ে তুমি নিজেকে হারাও,
আর আমি তোমাকে খুঁজে ফিরি
হাজার ভিড়ে, নিজের ভেতরের নিঃসঙ্গতায়…

সম্পর্কটা কী অদ্ভুত নাহ?
যে তুমিটা আমার সব চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু
অথচ.. আমি হয়তো তোমার একটুও না…
তবুও আমি অপেক্ষা করি।
কারণ ভালোবাসা কখনো হিসেব করে না, শুধু নিঃশব্দে সয়ে যায়…

হয়তো একদিন তুমি বুঝবে,
অথবা বুঝবে না কোনো দিনই…

কখনো স্রোতস্বিনী নদীর ঢেউ থেমে গেলেও
আমার এই অপেক্ষা কিন্তু থমকে দাঁড়াবে না
একদিন ঠিকই গল্প হয়ে রয়ে যাবে, তোমার অন্তরে।

 

গ্রীষ্ম এলো

গ্রীষ্ম এলো রোদ ঝলমল,
দুরন্ত বালকের চোখ টলমল,
আম কাঁঠাল তাল পাকে ডালে-
মিষ্টি গন্ধ ভাসে হাওয়ার পালে।

রোদে পুড়ে মেঠো পথ,
ঘাম ঝরেও দিনরাত।
তবু শিশু মনে হাসি খেলে-
জল ছিটিয়ে খুশি মেলে।

দুপুর বেলা ঝিম ধরে
বসে থাকি গাছের তলে
গ্রীষ্ম মানে রৌদ্র-ঝড়, একটু কষ্ট
তবুও শৈশবটা কারো না হোক নষ্ট।

 

বৃষ্টির নরম গান

বাইরে ঝরে বৃষ্টিধারা
জলাশয়ে ব্যাঙের সাড়া।
মৃদু হাওয়া ছুঁয়ে যায়
মনটা কোথায় হারিয়ে যায়।

টুপটাপ শব্দের রাত
ভিজে ওঠে নীরব প্রভাত।
শীতল ছোঁয়া, নরম ছায়া,
প্রকৃতির যেন গল্প গাওয়া।

চুপচাপ বসে শুনি গান,
ব্যাঙের ডাকে ভরে প্রাণ।
বৃষ্টিভেজা নরম হাওয়া,
মনটা আমার ভেসে যাওয়া।

 

চাঁদনি রাতের স্মৃতি

এখন রাতটা বেশ গভীর, ঝুমঝুমে নীরবতা
হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি তুমি পাশে নেই।
ভাবলাম হয়তো ওদিকটাতে আছো,
বারান্দার পূর্ণিমা চাঁদের আলো মাখছো।

ধীর কদমে হাওয়া মাখতে ওখানে গেলাম,
হুহু.. বাতাস বইছে নীরবে, মন ভাসছে স্মৃতিতে।
তুমি তো পাশেই রয়েছো ভেবে আঁখি মুদি,
জমে আসে চোখে চাঁদের আলো,
মনটা ভরে ওঠে গভীর প্রেমানুভূতিতে।

তোমাকে ছুঁতেই.. হঠাৎ হাতটা লোহার গ্রীলে আটকে গেল,
হৃদয়ের জানালায় তুমুল ঝড় উঠছে, শা শা করে।
নিঃশ্বাসের ভাঁজটা ক্ষীণ হয়ে আসে,
তুমি তো ওপারে, আকাশের শেষ সীমানায়, ছুঁতে না পারার ভুল
আর আমি এখানে- তবুও হৃদয়টা পূর্ণ তোমার ছায়ায়।

তোমাকে হারিয়েছি বছর খানেক হলো,
তবু মনে হয় তুমি পাশেই তো রয়েছো।
এই রাত, এই নিঃশব্দ আঁধার, এই চুপচাপের মাঝেই
এ ভেবেই শীতল বাতাসে তোমার গন্ধ পাই,
চাঁদের আলোয় খুঁজে পাই তোমার মুখ।

নীরবতার ঘর ভরে যায় শুধু তোমার কথা দিয়ে,
একেকটা সিক্তার ঝাপটা মনে পড়ে তোমার ছোঁয়ায়,
ওরে প্রিয়, এই রাতে আমি শুধু তোমাকেই স্মরণ করি।
হয়তো এক চাঁদনি রাতে ফিরে আসবে তুমি,
আর শূন্যতা ভরে উঠবে আমার প্রেমের আলোতে।