আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বাংলায় বর্ষাকাল। বর্ষাকাল মানেই গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে ক্লান্ত গ্রামবাংলার কাছে যেন প্রাণের আরাম। চাতক পাখির জল চাওয়ার মতো করে মানুষও তাই দিন গোনে বৃষ্টির। অবশেষে মেঘের আড়াল সরিয়ে নামে বর্ষা। সঙ্গে আসে প্যাচপ্যাচে কাদা, পথে ঘাটে জমা জল আর তা থেকে পোকামাকড়ের উপদ্রব। এ সময়ে স্যাঁতস্যাঁতে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মোকাবিলা করতে ভরসা জোগায় মরসুমের নানান ফল। তাই শরীর সুস্থ রাখতে ডায়েট তালিকায় প্রতিদিন রাখুন পছন্দসই কিছু ফল।
শহরে বর্ষা নামলেও ফলের বাজারে বেশ খানিকটা জায়গা দখল করে রাখে আম, কাঁঠাল এবং পেয়ারারা। তবে মরসুমি ফলের জায়গা সবার উপরে। রইলো এরকমই বর্ষাকালের কিছু মরসুমি ফলের বিবরণ।

১। আনারস (Pineapple) – এ সময়ে ফলের বাজারে রাজকীয় মেজাজে থাকেন ইনি। পুষ্টির অভাব পূরণে আনারসের জুড়ি মেলা ভার। এতে আছে প্রচুর ভিটামিন এ, সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাস। এতে ব্রোমেলিন নামক এনজাইম থাকে যা হজমশক্তি বৃদ্ধি করে। ভিটামিন সি ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশি প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে। জ্বর ও জন্ডিস প্রতিরোধেও আনারস বেশ উপকারী। আনারসে থাকা ক্যালসিয়াম হাড়ের ক্ষয় প্রতিরোধে কাজ করে। পাশাপাশি এই ফলে কোনো ফ্যাট না থাকায় পরিমিত পরিমাণে আনারস খেলে কমতে পারে ওজনও। এসময়ে নিমন্ত্রন বাড়ির শেষ পাতেও পড়ে আনারসের চাটনি।

২। করমচা (Karamcha)–“আয় বৃষ্টি ঝেপে, ধান দেব মেপে। লেবুর পাতায় করমচা, ঝড়-বৃষ্টি ঝরে যা”। ছোটোবেলার ছড়াতেই বলা ছিল বর্ষার এই ফলের কথা। এটি ঔষুধি ফল হিসেবে পরিচিত। বর্তমান সময়ে দেশের অনেক এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ এবং বিক্রি হয় করমচা। বৃষ্টি ভেজা করমচা ফল, পাতা ও গাছ দেখতে সত্যিই খুবই সুন্দর। করমচা ফলের গাছ বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই কমবেশি দেখতে পাওয়া যায়। এর ফুল দেখতে অনেকটা বকুল ফুলের মতো। ফলের রং প্রথম দিকে হয় সবুজ অথবা সাদাটে। তারপর ক্রমেই লালচে হতে শুরু করে। সম্পূর্ণ পেকে গেলে এটি গাঢ় লাল থেকে কালো বর্ণ ধারণ করে। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফলটি ভিটামিন সি ও আয়রনে পরিপূর্ণ। করমচা দিয়ে তৈরি করা যায় সুস্বাদু চাটনি, আচার এবং জেলি।

৩। আঁশ ফল (Fiber Fruit) – বর্ষাকালের আরও একটি ফল হল আঁশ ফল বা কাঠ লিচু। বৈজ্ঞানিক নাম Dimocarpus Longan। ক্রান্তীয় অঞ্চলে এই ফলের বেশি দেখা মিললেও বর্ষাকালে বাংলার বাজারে ফলের ঝুড়িতে শোভা পায় আঁশ ফল। দেখতে কিছুটা লিচুর মত হলেও এই ফল স্বাদে লিচুর মতো মিষ্টি নয়। আঁশফলের শুকনো শাঁস থেকে তৈরি হয় ভেষজ ওষুধ। এই ফলের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার, যা হজমের সমস্যা, অনিদ্রা এবং অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়াও যে কোনও রকম অ্যালার্জি, ক্যানসার এবং হৃদরোগ উপশমেও কাজে লাগে এ গাছের পাতা। আঁশ ফল খেলে রক্ত শর্করার পরিমাণও থাকে নিয়ন্ত্রণে।

৪। আমড়া (Hog plum) – বর্ষাকালে বাজারে গেলেই চোখে পড়বে জিভে জল আনা সবুজ রঙের দেশি আমড়া। একাধিক দামি ফলের চেয়ে আমড়ায় প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও আয়রনের পরিমাণ অনেক বেশি। স্বাদে টক-মিষ্টি। কাঁচা খাওয়ার পাশাপাশি সুস্বাদু আচার, চাটনি ও জেলিও তৈরি করা যায় আমড়া দিয়ে। অনেকে আবার তরকারি হিসেবে রান্না করে খান আমড়া। ডাক্তারি মত অনুযায়ী, দাঁতের সমস্যায় দারুণ উপকারি এই ফল। প্রচুর আয়রন থাকায় রক্তস্বল্পতা, অরুচিভাব, বদহজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে সহায়তা করে আমড়া। এছাড়াও বিভিন্ন রকমের ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, সর্দি, কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জায় আমড়া অত্যন্ত উপকারী।

৫। কালোজাম (Blackberry) – মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আগস্ট পর্যন্ত অর্থাৎ গোটা বর্ষাকাল জুড়ে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় কালোজাম। স্বাদে কোনোটি মিষ্টি, কোনোটি আবার একটু টক-মিষ্টি। কালোজামে ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাসিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় উপাদানগুলির উপস্থিতি হাড় এবং দাঁতকে মজবুত করে। এই ফলে রয়েছে অ্যাস্ট্রিঞ্জেন্ট, যা ত্বকের নানা রোগের ক্ষেত্রে খুবই উপকারি। কালোজামে সুক্রোজ একেবারেই থাকে না। এছাড়াও এর বীজে থাকে জাম্বোলিন। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে কালোজাম। রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়াতে ডায়াবেটিকদের প্রতিদিন কালোজাম খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা৷ শুধু তাই নয় হার্টের সমস্যাতেও দারুণ কার্যকর ফল হল কালোজাম।
