পুরোনো লাইব্রেরি বা বুকশেলফের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কি আপনার নাকে অদ্ভুত এক চেনা গন্ধ এসে লাগে? একটু মিষ্টি, কিছুটা কাঠের মতো, আর কিছুটা ধুলোমাখা এক প্রাচীন অনুভূতি। এই গন্ধ নাকে আসতেই মনটা যেন এক নিমেষে শান্ত হয়ে যায়। আপনি কি জানেন, এই অদ্ভুত ভালোবাসার একটি চমৎকার নাম আছে? একে বলা হয় ‘বিব্লিওসমিয়া’ (Bibliosmia)। ২০১৪ সালে অধ্যাপক অলিভার টিয়ার্ল গ্রিক শব্দ ‘বই’ এবং ‘গন্ধ’ মিলিয়ে এই চমৎকার শব্দটি তৈরি করেন। কিন্তু কেন পুরোনো বইয়ের গন্ধে আমরা এতটা মোহিত হই? এর পেছনে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞান আর স্মৃতির এক দারুণ মিশেল।
১. স্মৃতির জানালায় কড়া নাড়ে সুবাস পুরোনো বইয়ের গন্ধ আমাদের অবচেতন মনে শৈশব বা কৈশোরের স্মৃতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে। বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের মস্তিষ্কে গন্ধ শোঁকার স্নায়ু সরাসরি আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশের সাথে যুক্ত। চোখের দেখা বা কানের শোনার চেয়েও নাকের ঘ্রাণ অনেক দ্রুত মস্তিষ্কে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তাই পুরোনো বইয়ের গন্ধ পাওয়া মাত্রই আমাদের মনে পড়ে যেতে পারে স্কুল লাইব্রেরির সেই শান্ত দুপুর কিংবা প্রিয় কোনো মানুষের দেওয়া উপহারের কথা। কোনো কারণ ছাড়াই মন ভালো হয়ে যাওয়ার রহস্যটি আসলে এখানেই!
২. পাতার ভাঁজে রসায়নের জাদু পুরোনো বইয়ের এই জাদুকরি সুবাস আসলে রসায়নের এক অদ্ভুত খেলা। বইয়ের পাতা তৈরি হয় কাঠ থেকে, যাতে থাকে ‘সেলুলোজ’ ও ‘লিগনিন’ নামের দুটি উপাদান। সময় গড়ানোর সাথে সাথে এই উপাদানগুলো বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশে ভেঙে যেতে থাকে এবং তৈরি করে ‘ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ডস’ বা উদ্বায়ী জৈব যৌগ। এই যৌগগুলো থেকেই মূলত ভিন্ন ভিন্ন চার ধরনের ঘ্রাণ তৈরি হয়: – ভ্যানিলিন: এর কারণে বই থেকে ভ্যানিলা বা মিষ্টি বিস্কুটের মতো সুবাস আসে। – বেনজালডিহাইড: এটি যোগ করে হালকা বাদামের আমেজ। – ফারফিউরাল: এই উপাদানের কারণে মনে হয় যেন মাত্র ওভেন থেকে নামানো সেঁকা পাউরুটির গন্ধ। – গুয়াইয়াকল: বইয়ের গন্ধে হালকা পোড়া কাঠ বা ক্যাম্পফায়ারের আমেজ নিয়ে আসে এটি। অর্থাৎ, একটি পুরোনো বইয়ের ভেতর যেন আস্ত এক বেকারি আর ক্যাম্পফায়ারের ঘ্রাণ লুকিয়ে আছে!
৩. নতুন বনাম পুরোনো বইয়ের লড়াই নতুন বইয়ের গন্ধ কিন্তু একদমই আলাদা। নতুন বই খুললে আমরা যে কড়া ঘ্রাণ পাই, তা মূলত কাগজের ওপর ব্যবহৃত কালি, আঠা আর কাগজ সাদা করার রাসায়নিকের মিশ্রণ। এটি অনেকটা নতুন গাড়ির সুবাসের মতো—তাজা এবং তীব্র। কয়েক বছর পার হওয়ার পর রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই কড়া গন্ধটিই ধীরে ধীরে পুরোনো বইয়ের সেই মিষ্টি ও মাদকতাময় সুবাসে পরিণত হয়।
৪. ঘ্রাণ নেওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ? অনেকেই মনে করেন পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণ নেওয়া হয়তো ক্ষতিকর। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুকনো এবং পরিষ্কার পুরোনো বইয়ের গন্ধ শোঁকা একদমই নিরাপদ। এটি স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি করে না। সতর্কতা: যদি বইয়ের পাতা স্যাঁতসেঁতে হয় কিংবা তাতে ছত্রাক (Mold) জন্মায়, তবে সেই বইয়ের ঘ্রাণ না নেওয়াই ভালো। ছত্রাকযুক্ত বইয়ের গন্ধ থেকে হাঁচি, কাশি বা অ্যালার্জির সমস্যা হতে পারে। তাই বইয়ের যত্ন নিন এবং কেবল শুকনো ও সতেজ পুরোনো বইয়ের সুবাসই উপভোগ করুন। উপসংহার: পুরোনো বই শুধু জ্ঞানের ভাণ্ডার নয়, এটি স্মৃতির এক সুগন্ধি আধারও বটে। পরের বার যখন কোনো পুরোনো বই হাতে পাবেন, পাতা উল্টে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিন। দেখবেন, যান্ত্রিক জীবনের সব ক্লান্তি নিমেষেই ধুয়ে মুছে গেছে!
